জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভূমিহীন ও গৃহহীনরা পেলেন স্বপ্নের নতুন ঠিকানা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে গৃহহীন পরিবারের জন্য সরকারি খাস জমিতে গৃহ নির্মাণ করা হয়।

২৪ জানুয়ারি শনিবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উপকারভোগীদের মাঝে বাড়ির চাবি ও দলিল হস্তান্তর কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেল চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৩১৯ অসহায় ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তৈরি হয়েছে গৃহহীনদের স্বপ্নের বাসভবন। চারদিকে ইটের দেয়াল এবং উপরে লাল-সবুজ টিনের ছাউনি। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ এ উপহার পেয়ে দারুণ খুশি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারগুলো।

প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্স উপলক্ষে জাকজমকপূর্ণভাবে সাজানো হয় এলাকাটি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গৃহহীনদের মাঝে বাড়ি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার হুমায়ন খন্দকার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সাংসদ ডাঃ সামিউল ইসলাম শিমুল, জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ, সিভিল সার্জন ডাঃ জাহিদ নজরুল চৌধুরী, পুলিশ সুপার এএইচএম আব্দুর রকিব, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ মইনুদ্দিন মণ্ডল, সদর আসনের সাবেক সংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওদুদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সংরক্ষিত আসনের মহিলা সাংসদ ফেরদৌসি ইসলাম জেসি, জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ রুহুল আমিন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) একেএম তাজকির উজ-জামান, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল ইসলাম সরকার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আনিসুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব আলম খাঁন, ৫৩ বিজিবি ব্যাটলিয়নের অধিনায়ক কর্নেল সুরুজ মিয়া, জেলা যুব লীগের সভাপতি সামিউল হক লিটন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান মিজান।

ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ১৩০ জনের মধ্যে ৩৬ জনকে কবুলিয়তনামা হস্তান্তর করা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত গম্ভীরা পরিবেশনের মধ্যদিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জেলাবাসীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানানো হয়।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ‘আশ্রয়ণের অধিকার শেখ হাসিনার উপহার’ এই স্লোগানে এবং ‘বাংলাদেশের একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না’ প্রধানমন্ত্রীর এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫ উপজেলার ১৩১৯ ভূমি ও গৃহহীন পরিবারের জন্য খাস জমিতে গৃহ নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে জেলা প্রশাসন।

সূত্র জানায়, প্রত্যেক ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ২ শতাংশ খাস জমি বন্দোবস্ত প্রদান করে সেই জমির ওপর ঘর তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। দুই কক্ষের প্রতিটি গৃহের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্ধারিত নকশা অনুযায়ী সবগুলো ঘর তৈরি করা হয়েছে। প্রত্যেক সুবিধাভোগীর নামে সরকারি ২ শতাংশ খাস জমি বন্দোবস্ত প্রদানপূর্বক কবুলিয়ত দলিল রেজিস্ট্রেশন, নামজারি সম্পন্নকরণ ও গৃহ প্রদানের সনদ প্রদান সম্পন্ন করে সুবিধাভোগী পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম সরকার জানান, সদর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ৮টি এলাকায় গুচ্ছ আকারে বাড়িগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এর জন্য অবৈধ দখলে থাকা প্রায় ১২ বিঘা জমি উদ্ধার করেছি। তবে ভালো লাগার বিষয় এত দিন পরে সরকারের এতগুলো জমি ভালো কাজে ব্যবহার হচ্ছে। এটি আনন্দের বিষয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ১৩০টি ঘরের মধ্যে ৮ প্রতিবন্ধী, ৮ ভিক্ষুক, ৪২ জন বিধবাসহ অনেক গৃহহীন আছেন যারা এই ঘরগুলো পেয়েছেন।
মানপুরের এ গুচ্ছগ্রামে ৩৩ শিশু, ২৬ ছেলে শিক্ষার্থী, ৪৯ জন মেয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে। এখানে বসবাসের জন্য সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। সর্বোপরি একটি বলয় তৈরি করা হয়েছে যেন তারা উন্নত জীবনযাপন করতে পারেন। সবশেষে বলতে চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি আমরা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি বলে সত্যি আনন্দিত।

যা বললেন উপকারভোগীরা-
রেনু বেগম : স্বামী মারা গেছেন ১৫ বছর আগে। অন্যের বাড়িতে কাজ করে কুঁড়েঘরে জীবনযাপন করতেন তিনি। একটি ছেলে। সেও খোঁজ নেয় না। মেয়ের জামায়ও দিনমজুর। তাই তিনি নাতি-নাতনিকে নিয়ে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ৫৭/১৩০ নম্বর বাড়িতে। বয়সের ভারে আগের মতো চলতেও পারছেন না। কি খেয়ে থাকবেন সেটা নিয়ে চিন্তিত। তিনি বলেন, ঘর পেয়েছি এতে খুশি লাগছে; এখন ভিক্ষা করে হলেই চলতে পারবো। প্রধানমন্ত্রীর জন্য দোয়া করবো আজীবন।

জেমিয়ারা : বিধবা জেমিয়ারা। স্বামী মারা গেছেন ৭ বছর আগে। থাকতেন বাবা-মায়ের বাড়িতে। অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবন চালান। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ৭১/১৩০ নম্বর বাড়িতে একমাত্র ছেলে ও বউকে নিয়ে থাকবেন। তিনি বলেন, এই বাড়ি পেয়ে আমার বুক ভরে গেছে। বাড়ি না থাকার যে কষ্ট সেটা আমি জানি। প্রধানমন্ত্রীর জন্য আমি দোয়া করবো। আল্লাহ যেন তাকে দীর্ঘজীবি করেন।

জবেদা বেগম : ২০ বছর ধরে মানপুরে খুপড়িতে বসবাস করতেন জবেদা বেগম। ১০ বছর আগে স্বামীকে হারিয়ে রাস্তার ধারেই বসবাস করছিলেন তিনি। এখন প্রধানমন্ত্রীর ঘর পলেন। এক ছেলেকে নিয়ে তিনি থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ৬৮/১৩৬০ নম্বর বাড়িতে। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া পাকা বাড়ি ও দুই শতক জমি পাওয়ায় খুশির শেষ নেই তার। তিনি বলেন, বাড়ি পেয়ে আমি খুবই খুশি। কখনো ভাবিনি ইটের পাকা বাড়ি পাব। সৃষ্টিকর্তা যেন শেখ হাসিনাকে সুস্থ রাখে।

জেম আলী : ভূমিহীন দিনমজুর জেম আলী। তিনি পেয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বারিয়াডাঙ্গার মানপুর সল্লায় বাস্তবায়ন হওয়া ৭২/১৩০ নম্বর বাড়ি। গ্রামের বাড়ি জেলার গোমস্তাপুর উপজেলায়। ৩৬ বছর ধরে তিনি বালিয়াডাঙ্গায় শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। অবশেষে আপন গৃহ পেলেন তিনি। স্ত্রী মতিয়ারাকে নিয়ে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর দেয়া নিজ বাড়িতে। ফাইলবন্দি জমির দলিল দেখিয়ে তিনি বলেন, বাড়ি পেয়েছি এটা স্বপ্নের মতো লাগছে। কখনো ভাবিনি নিজের বাড়ি হবে। এ রকম বাড়ি তৈরির সামর্থ্যও আমার ছিল না। আজীবন আমরা প্রধানমন্ত্রীর জন্য দোয়া করবো।

Sharing is caring!