এক যুগের বেশি সময় ধরে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যসহ নানা দুর্নীতির মাধ্যমে ‘সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁস’ পেয়েছিলেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাড়িচালক আবদুল মালেক বাদল। সেই ‘ডিম’ বিক্রি করে বনে গেছেন শত শত কোটি টাকার মালিক।

বিভিন্ন সময়ে কয়েক শত লোক নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য করলেও এই তৃতীয় শ্রেণির সামান্য কর্মচারীর তো নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করার ইখতিয়ার কখনোই ছিল না। নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করেছেন স্বাস্থ্য খাতের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তাহলে কাদের স্বাক্ষরে ড্রাইভার মালেক নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য চালিয়েছেন? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন র‌্যাব, পুলিশ ও দুদক কর্মকর্তারা।
এদিকে গ্রেফতারকৃত গাড়ি চালকের ব্যক্তিগত অপকর্মের দায় নেবে না বলে গতকাল বুধবার জানিয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর। এ ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরে সিন্ডিকেট করে সীমাহীন দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার টাকা অবৈধভাবে আয় ও বিদেশে পাচার করা দুষ্টচক্রের তথ্য পেয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে দেশজুড়ে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের অনেক কর্মচারী, কর্মকর্তা ও এমনকি চিকিৎসক নেতার নাম ফাঁস করেছেন গ্রেফতারকৃত মালেক। এই সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিতে ও দুর্নীতির টাকায় আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়াদের গ্রেফতার করতে একযোগে কাজ শুরু করছে র‌্যাব ও দুদক। পেতে রাখা হয়েছে গোয়েন্দাজাল। দুদকের প্রাথমিক প্রায় ৪৫ জনের নাম উঠে এসেছে। এদের মধ্যে ৭-৮ জনের স্ত্রীর নামও রয়েছে। এসব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামছে দুদক। এর মধ্যে কয়েকজনকে শিগগিরই দুদকে ডাকা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বৈশ্বিক মহামারী করোনা সংকটের মধ্যে গত জুন মাসে মাসে রিজেন্ট ও জেকেজির ভয়াবহ জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি সামনে আসে। নানা আলোচনা-সমালোচনা জন্ম দেয়। সেই প্রতারণা ও জালিয়াতির ঘটনায় রিজেন্ট গ্রুপ চেয়ারম্যান গ্রেফতারকৃত সাহেদ করিম ওরফে সাহেদ ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের সেই সময়ের পরিচালক আমিনুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে গতকাল মামলার অনুমতি দিয়েছে দুদক।

গত রবিবার রাজধানীর তুরাগ থানাধীন কামারপাড়ার বাসা থেকে অস্ত্র, গুলি ও জাল টাকাসহ স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক দুই ডিজির গাড়ি চালক আবদুল মালেক ওরফে বাদলকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে শত কোটি টাকার বিপুল সম্পদের ভয়াবহ তথ্য। মঙ্গলবার থেকে ১৪ দিনের রিমান্ডে তুরাগ থানা হেফাজতে রয়েছে টাকার কুমির মালেক।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, মালেককে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের পর যে তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা বিস্ময়কর। সরকার চাইলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানসহ যে কোনো কাজ র‌্যাব আন্তরিকতার সঙ্গেই সম্পন্ন করবে। ম্যান্ডেটের বাইরে থাকলেও সরকার ও দুদক চাইলে দুর্নীতিরোধে কাজ চালিয়ে যাবে র‌্যাব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মালেকের সূত্র ধরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের দুর্নীতিবাজ চক্রের আরো অনেকের নাম বেরিয়ে আসছে। মালেক ধরা পড়ার পর দুর্নীতি করে যারা কোটি কোটি টাকা কামিয়ে বহাল তবিয়তে আছেন তারা এখন আতঙ্কে। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরসহ বিভিন্ন সেক্টরে দুর্নীতিবাজ চক্র ভেঙে দিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও র‌্যাব একসঙ্গে কাজ শুরু করছে।

এদিকে পুলিশ ও র‌্যাব সূত্র জানায়, রিমান্ডে চালক মালেককে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। কীভাবে রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে এই বাড়ি নির্মাণ করলেন- এমন প্রশ্নে মালেক দাবি করেছেন, ওই সম্পত্তি তার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া।

জমি পৈতৃক হয়ে থাকলেও বাড়ি করার অর্থ কোথায় পেলেন- এই প্রশ্নে তিনি দাবি করেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। তবে ঋণ নেয়ার যে অঙ্কের কথা বলছেন, তা দিয়ে এই আলিশান বাড়ি নির্মাণ করা অসম্ভব বলে জানান তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। পৈতৃকভাবে জমিদার থাকলে কেন গাড়ি চালকের চাকরি নিয়েছেন, এমন নানা প্রশ্নের জবাব মালেক দিতে পারছেন না বলে সূত্র জানায়।

মালেক জিজ্ঞাসাবাদে জানান, তাদের আদি নিবাস কুমিল্লায়। তবে তার বাবা আবদুল বারী এক সময় হাতিরপুল এলাকায় বসবাস করতেন। তিনি বড়ও হয়েছেন সেখানে। মালেকের বাবা সচিবালয়ে পিয়ন পদে চাকরি করতেন। ছোটবেলা থেকেই মালেক দুষ্ট প্রকৃতির ছিলেন।

তিনি ১৯৮২ সালে সাভারে একটি স্বাস্থ্য প্রকল্পে গাড়িচালক হিসেবে যোগ দেন। দুই বছর পর স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিবহন পুলে তার চাকরি স্থায়ী হয়। এরপর তিনি প্রেষণে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অধিদফতরে গাড়িচালক হিসেবে বদলি হন। গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত কাগজে-কলমে সেখানেই তিনি গাড়িচালক ছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক শাহ মনিরের আমলে মূলত তার উত্থান। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ডিজির গাড়ি চালাতেন তিনি। সর্বশেষ চালিয়েছেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এএইচএম এনায়েতের গাড়ি। এর আগে চালিয়েছেন সদ্য সাবেক ডিজি আবুল কালাম আজাদের গাড়ি। দুজনের সঙ্গে মালেকের সখ্য ছিল।

অপরদিকে শুধু গাড়িচালক মালেক নয়, স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমন অন্তত ৪৫ কোটিপতি মালেকের নাম রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর তালিকায়। এ তালিকায় নাম রয়েছে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা থেকে শুরু করে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীও। প্রত্যেকের নামেই রয়েছে অস্বাভাবিক অর্থ, বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার ও ক্ষমতার অপব্যবহার। রয়েছে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে ডাকা একেকজন করে দুদকে তলব করা হবে।

ড্রাইভার মালেকের অভিযোগের দায় তার ব্যক্তিগত’: স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের কোনো পরিবহন পুল নেই, ড্রাইভার মালেকের বিরুদ্ধে উত্থাপতি সব অভিযোগের দায় তার ব্যক্তিগত। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক ( প্রশাসন) ডা. মোস্তফা খালেদ আহমদ এই কথা জানিয়েছেন। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর থেকে ‘বরখাস্তকৃত গাড়িচালক জনাব মো. আব্দুল মালেক এর বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের বক্তব্য’ শীর্ষক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানিয়েছেন তিনি।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের অধীনে গত বছরের ২৪ নভেম্বর স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর গঠিত হয়। বিভাগের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন সে বছরের ৩১ ডিসেম্বর মহাপরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। গাড়িচালক আব্দুল মালেককে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে প্রেষণে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরে ন্যস্ত করা হয়।

এতে আরো বলা হয়, প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে আজ পর্যন্ত নবগঠিত স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর থেকে কোনো প্রকার কেনাকাটা, কর্মচারী নিয়োগ, পদায়ন বা পদোন্নতির কাজ করা হয়নি। কাজেই গাড়িচালক মো. আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সঙ্গে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর বা অধিদফতরের মহাপরিচালকের কোনো প্রকার সংশ্লিষ্টতা নেই। তাই তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের দায় তার ব্যক্তিগত। অধিদফতর এ দায় নেবে না।

Sharing is caring!