বিশ্বকে শান্তিময় রাখতে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে ক্ষমতাশীল দেশগুলোর ঘুম ভাঙতে হবেই

মানবিক দৃষ্টিকোন ও মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা লাখ লাখ ভয়ার্ত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল। যেখানে বিশ্বে অনেক প্রভাবশালী ও মুসলিম রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াতে বা প্রতিবাদ জানাতে পারেনি। বাংলাদেশ সরকার শত প্রতিকুলতার মাঝেও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন সেই দিন। ঝুঁকি নিয়েই উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল বর্ডার। মানুষের জীবনের মূল্য দিয়েছে বাংলাদেশ। মিয়ানমার যখন রক্তের খেলায় মেতেছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৭ কোটি মানুষের প্রতিনিধি হয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তবে দু’বছর পার হলেও এখনো মিয়ানমার বা বিশ্ব নেতৃবৃন্দ নিরব ভূমিকা পালন করছে। মাঝে মাঝে কেউ কেউ কয়েকটি বিবৃর্তি দিয়ে নিজেদের দায় সাড়া অবস্থান দেখাচ্ছে। কয়েকবাব মিয়ানমার কথা দিয়েও রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়ে কোন ধরনের উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের ভূমিকা বিপদগামী করে তুলছে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা ইতিমেধ্য হত্যা করেছে বাংলাদেশীকে। মাদক ও অস্ত্রসহ নানা ধরনের অপরাধমূলোক কাজে জড়িয়ে পরছে তারা।

 

 

বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারে সহিংসতায় পালিয়ে আসা লাখ লাখ ভয়ার্ত রোহিঙ্গাদের নিয়ে আর্ন্তজাতিক সংস্থা ইউনিসেফ জানাচ্ছে যে, এক বছর আগে মিয়ানমারে সহিংসতার মুখে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা লাখ লাখ ভয়ার্ত রোহিঙ্গার ঢল নেমেছিল বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলের সৈকতে।

তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই ছিল শিশু। তারা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন রাখাইনে বীভৎস আক্রমনের কথা; আত্মীয়স্বজন, ঘরবাড়ি ও প্রতিবেশীদের হারানোর কথা।

মিয়ানমারের সীমানার অদূরে, বাংলাদেশের কক্সবাজারের পাহাড়গুলোতে গাদাগাদি করে বাস করে ৯১৯,০০০ রোহিঙ্গা। পাহাড়ি বনভূমি উন্মুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই আশ্রয় শিবির। পার্শ্ববর্তী টেকনাফ ও উখিয়াতেও গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ক্যাম্প।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের মধ্যে বেশীরভাগ, প্রায় ৭০০,০০০ জন এসেছেন ২০১৭ সালের আগস্টের শেষের দিকে রাখাইনে বড় মাপের সহিংসতা শুরু হবার পর। বাকিরা পাড়ি দিয়েছিলেন আগেই, বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন এড়াতে।

বাংলাদেশের সরকারের নেতৃত্বে, এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন দেশের সহযোগিতায় রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে এড়ানো গেছে অনেক বড় বিপর্যয়। জরুরি অবস্থার প্রথম থেকেই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ত্রান ও মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য কাজ করেছে ইউনিসেফ ও বিভিন্ন বেসরকারি ও দাতা সংস্থা।

রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলোতে মানবাধিকার কর্মীদের কাজের পরিধি বেড়ে এখন অনেক বড় আকার ধারণ করেছে। কিন্তু পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের সাহায্য করার ক্ষমতা এখনও অনেক কম।

সঙ্কটের প্রথম দিনগুলোর চরম বিশৃঙ্খলা পার করে অনেক দূর এগিয়ে এসেছি আমরা। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবির ও তাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশীদের জীবনে নেমে এসেছে এক ধরনের স্বাভাবিকতা। কিন্তু এই স্বাভাবিক অবস্থা সবসময় টিকবার নয়।

রাখাইনে বীভৎস হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের স্মৃতি, ঘরবাড়ি হারানোর যন্ত্রণা রয়ে গেছে লাখ লাখ মানুষের মনে।

“এই বিপর্যয় খুব তাড়াতাড়ি মোকাবেলা করতে হবে। রোহিঙ্গাদের – বিশেষ করে তাদের শিশুদের – দাবী ও প্রাপ্য এর চাইতে কম হতে পারেনা,” – ম্যানুয়েল ফনটেইন, ইউনিসেফের জরুরি অবস্থা বিষয়ক পরিচালক

 

 

 

শিশুদের জন্য বিপদজনক স্থান
কঠিন পরিবেশকে শিশুদের জন্য নিরাপদ করে তুলতে হবে

 

 

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো আগের তুলনায় এখন অনেক গোছানো। এক বছর আগে, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ত্রানে পাওয়া প্লাস্টিকের চাদর ও বাঁশ দিয়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে কোন রকমে আশ্রয় তৈরি করছিলো।

সেই সময়কার কাদাভরা রাস্তাগুলো এখন ইট দিয়ে স্থায়ী করা হয়েছে। বালির ব্যাগ এবং বাঁশের সেতু ব্যাবহার করে খাড়া পাহাড়গুলোতে চলাফেরা সহজ করা হয়েছে। রাস্তায় আলো দেওয়ার জন্য বসানো হয়েছে আরো অনেক সোলার বাতি। শরণার্থী পরিবারগুলোর জন্য বিপদ একটু হলেও কমিয়ে আনা হয়েছে।

ঘিঞ্জি এই আশ্রয়গুলোতে রোহিঙ্গা শিশুদের খেলাধুলা ও বিকাশের জন্য ১৩৬ টি শিশুবান্ধব কেন্দ্র চালায় ইউনিসেফ। সহিংসতার শিকার এই শিশুদের অনেকেরই প্রয়োজন মানসিক সাহায্য। তাদের মানসিক অবস্থা স্বাভাবিকে ফিরিয়ে আনার জরুরী কাজটি করে যাচ্ছে শিশুবান্ধব কেন্দ্রের চিকিৎসক, সমাজকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরা।

“এই কেন্দ্রগুলো ক্যাম্পের সকল শিশুদের জন্য উন্মুক্ত। তারা এখানে তাদের মত করে খেলতে, ছবি আঁকতে ও পড়তে পারে। শিশুরা এখানে ব্যাস্ত থাকলে তাদের বাবা-মা নিশ্চিন্তে তাদের কাজ করতে পারে,” বলেন উইলিয়াম কলি, কক্সবাজারে ইউনিসেফের চাইল্ড প্রোটেকশন প্রোগ্রাম ম্যানেজার।

রোহিঙ্গা পরিবারগুলো তাদের আচার অনুযায়ী কিশোরী মেয়েদের ঘর থেকে বের হতে মানা করে। রাখাইনে সেই সীমানা ছিল তাদের গ্রামের বাড়ির উঠান। এখন রোহিঙ্গা কিশোরীদের দিন কাটে ছাপড়া ঘরের চার দেওয়ালের মাঝে। কাজের মধ্যে আছে শুধু রান্নাবাড়া ও ঘর পরিষ্কার রাখা। যৌন হামলা ও পাচারেরও ভয়ে থাকে তারা।

বাড়ি তৈরির জন্য বাঁশ বহন করে নিয়ে যাছে রোহিঙ্গা শিশুটি ওদের কথা মাথায় রেখে ইউনিসেফের সাহায্যে ক্যাম্পের সমাজকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে ক্লাব তৈরি করেছে। ওয়ার্ড ভিত্তিক এই ক্লাবগুলোর সদস্য ৬০,০০০ রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরী। ক্লাবগুলোর মাধ্যমে তারা জীবনে চলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং শিশু অধিকার বিষয়ক জ্ঞান পেয়ে থাকেন। বাল্যবিয়ে, শিশু শ্রম ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা হয়। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়েও অনেক সাহায্য দেওয়া হয় ক্লাবগুলোর মাধ্যমে।

রোহিঙ্গা শিশু ও তাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশি শিশুদের মধ্যে সৌহার্দ তৈরি করাও ইউনিসেফের একটি লক্ষ্য। “এই বিপর্যয়ে রোহিঙ্গাদের সাহায্যে সবার আগে এগিয়ে এসেছিল এখানকার স্থানীয়রা। এর জন্য অনেক কষ্টও পোহাতে হয়েছে তাদের,” বলেন জিন মেটেনিয়ের, ইউনিসেফের কক্সবাজার ফিল্ড অফিসের প্রধান।

“আমরা আমাদের কাজ দ্বিগুন করছি যাতে বাংলাদেশি শিশুরা তাদের সহানভূতির জন্য কোন ক্ষতির সম্মূখীন না হয়।”

 

 

একটি প্রজন্মের হারিয়ে যাওয়া রোধ করা
কিশোর-কিশোরীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা সম্প্রসারণ

 

 

রাখাইনে ২০১৭ সালের বিপর্যয়ের পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা নতুন শরণার্থীদের মধ্যে ৩৮১,০০০ রোহিঙ্গা শিশুর জরুরী শিক্ষার ব্যাবস্থা করা ছিল একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।

১৪ বছরের ছোট শিশুদের অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করে ইউনিসেফ এবং সহযোগী সংস্থ্যাগুলো। ২০১৮ সালের জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় ১৪০,০০০ শিশুকে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা হয়।

প্রশিক্ষন দেওয়া হয় ৩০,০০০ এরও বেশী শিক্ষককে, যাদের মধ্যে আছে বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের নাগরিক। অনেককাল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এই জনগোষ্ঠীর পড়ালেখার প্রতি আকাঙ্খা নজর কাড়ার মত। প্রতিদিন রোহিঙ্গা শিশুদের ঢল নামে ইউনিসেফের শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে।

কিন্তু রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীরা আমাদের কাছে প্রায়ই একটি ক্ষোভ প্রকাশ করে। তারা এই শিক্ষাযজ্ঞ থেকে বঞ্চিত বোধ করে।

“এখানের স্কুলগুলোতে ছোট বাচ্চারা যায়। কিন্তু আমার বয়সের ছেলেদের জন্য ওখানে কিছু নেই। স্কুলে না পড়তে পেরে আমার মনে খুব কষ্ট হয়,” জানায় মোহামেদ, একজন রোহিঙ্গা কিশোর।

 

 

স্বাধীনতার মহানায়ক, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তলা বিহীন ঝুঁড়ির এই বাংলাদেশ কি পারে তাই দেখিয়েছ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্বকে শান্তিময় রাখতে হলে দ্রুতই রোহিঙ্গাদের বিষয়ে ক্ষমতাশীল দেশগুলোকে কাজ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে যেতে সব ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে।