ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বড় আকারে দেখা দিলেও জাতীয় দুর্যোগ নয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক

আনলিমিটেড নিউজ ডেস্ক: স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বড় আকারে দেখা দিয়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বেই এখন ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। ফিলিপাইনে ৬০০ জন মারা গেছেন ডেঙ্গুতে। অন্যান্য দেশেও লাখ লাখ লোক আক্রান্ত হচ্ছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সর্বশক্তি দিয়ে ডেঙ্গু মোকাবেলায় কাজ করছে।

 

 

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় দৈনিক যুগান্তরের বোর্ডরুমে ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতায় করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম।

 

 

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সব মন্ত্রণালয়ের কর্মক্ষেত্র ভাগ করা আছে। সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। মিডিয়াও ভালো কাজ করছে। এটি কোনো জাতীয় সংকট নয়। আগে কলেরায় গ্রামের পর গ্রাম সাফ হয়ে যেত। কিন্তু ডেঙ্গুতে মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। এখন আমাদের সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে ডেঙ্গু মোকাবেলায় কাজ করতে হবে।

 

 

বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে দৈনিক যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলম বলেন, এখন ডেঙ্গুর বিষয়টিই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। সবচেয়ে আলোচিত ও উৎকণ্ঠার বিষয় হচ্ছে এটি। এ রোগ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী, তা জানতেই এ আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে। আশা করি, এটি সবার জন্যই কাজে আসবে।

 

 

গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে সাইফুল আলম বলেন, একটি পত্রিকা হিসেবে যুগান্তরের সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। এ দায় থেকেই ডেঙ্গু ভয়াবহতা সম্পর্কে দেশবাসীকে সচেতন করতে এ বৈঠক। দেশবাসী এ আলোচনা থেকে উপকৃত হবেন।

 

 

এতে আলোচনা করেন কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, দেশে ১৯৬৪ সালে প্রথম ডেঙ্গু ধরা পড়ে, তখন এটিকে বলা হতো ঢাকা ফেভার। এর পর ২০০০ সালে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু দেখতে পাই আমরা। পরবর্তী বছরগুলোতে কমবেশি ডেঙ্গু হয়েছে। এর মধ্যে চিকুনগুনিয়া হয়েছে কয়েক বছর। এ বছর অনেক বেশি মানুষের ডেঙ্গু হয়েছে।

 

 

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে প্রতি বছর আমরা তিনটি জরিপ চালাই। সেই তিনটি জরিপে আমরা এডিসের ঘনত্ব দেখি। এতে আমরা বলতে পারি- এ বছর সংক্রমণ কেমন হবে। মার্চের শুরুতে সার্ভে করে দেখতে পাই- এডিস মশার ঘনত্ব ২০-এর ওপরে। কেন এমনটি হলো?

 

 

তিনি বলেন, আপনারা যদি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড দেখেন- ১৯৫৩ সালের পর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে এত বৃষ্টিপাত হয়েছে যে, জলবায়ুর পরিবর্তনের একটি প্রভাব এখানে রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে এডিসের ঘনত্ব বেড়ে গেছে। গত বছর ডিমগুলো যে প্রকৃতিতে ছিল, ফেব্রুয়ারিতে সেই ডিম ফুটে অনেক এডিস মশার প্রজনন হয়েছে। মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে তার বিস্তার ঘটেছে।

 

 

ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপ বা প্রজাতি ভিন্ন ভিন্নভাবে সক্রিয় থাকতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, যদি আমরা আগে থেকে সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা করতে পারতাম, যেটি আমাদের দেশে খুবই দুর্বল, তা হলে এতটা বাড়তে পারত না। সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার মধ্যে এক নম্বর হচ্ছে- পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা। এডিস মশা যেখানে হয়, যেসব পাত্রে হয়, সেই পাত্রগুলো যদি আমরা কমাতে পারি; মশার উৎস কমিয়ে আনতে হবে। এটি হচ্ছে মশক ব্যবস্থাপনার প্রথম কাজ। দ্বিতীয় হচ্ছে- জৈবিক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

 

 

‘তৃতীয় হচ্ছে- পেস্টিসাইড বা কেমিক্যাল কন্টোল কিংবা কীটনাশক ব্যবহার। এর মধ্যে লার্ভিসাইড ও এডাল্টিসাইড রয়েছে। আর চার নম্বর হচ্ছে- এতে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।’

 

 

জাপানে মশা নিয়ে পিএইচডি করা এ অধ্যাপক বলেন, ডেঙ্গুর পরিস্থিতিতে সবার আগে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রতিটি নাগরিক যদি তার বাড়ির আশপাশ পরীক্ষা করে পানি জমে থাকা পাত্র শেষ কিংবা উল্টিয়ে রাখেন এবং যারা ভবন নির্মাণ করছেন, তাদের নির্মাণস্থলে ইট ভিজানোর চৌবাচ্চা, ড্রামে জমে থাকা পানি, বেইসমেন্ট জীবাণুমুক্ত রাখেন, তবেই এডিসের বিস্তার রোধ করা সম্ভব। আর সিটি কর্পোরেশনকে উড়ন্ত মশাগুলো মেরে ফেলতে হবে।

 

 

তিনি বলেন, নগর ভবনের মশক নিয়ন্ত্রণ সেল শক্তিশালী করতে হবে। যারা মশার আচরণ জানবে, তাদের দায়িত্ব দিতে হবে। যারা মশা চেনে তারা নগর ভবনে নেই।

 

 

আলোচনায় অংশ নিয়ে দৈনিক যুগান্তরের সহকারী সম্পাদক মাহবুব কামাল বলেন, দক্ষিণ এশিয়া ও অন্যান্য দেশে মশার প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। জলবায়ু পরিবর্তনে মশা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। অন্যান্য বছর ডেঙ্গুর লক্ষণ যেমন স্পষ্ট ছিল, এবার সেটা না। এবারের ডেঙ্গুতে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ফেইলর হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু নিজেরা শক্তি অর্জন করে কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। ডেঙ্গুর সময়কাল এপ্রিল থেকে অক্টোবর। আগামী তিন মাস আমরা ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছি।

 

 

তিনি বলেন, ডেঙ্গু মহামারীকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা যেতে পারে। বেসামরিক বাহিনীর সঙ্গে সামরিক বাহিনীকেও যুক্ত করা যেতে পারে। দোষারোপের রাজনীতি থেকে বাঁচতে সর্বদলীয় ঐক্য গঠন করা যেতে পারে।