সেই ১৯৪৭ সালের পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি হচ্ছে ধর্ম ভিত্তিক। অথবা আপনি একে, ধর্ম ব্যবহার করে ক্ষমতায় থাকাকেও বলতে পারেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এখানে ধর্ম কেন এতো ব্যবহার হচ্ছে? কারন এই উপমহাদেশের মানুষ তার নিজের ধর্মের জন্য জান প্রাণ দেবার জন্য প্রস্তুত। আর এই সুযোগটি রাজনীতিতে ব্যবহার হয়। মজার বিষয় হচ্ছে এই উপমহাদেশের সব রাজনৈতিক দল বলবে যে, দেশের জনগণ হচ্ছে ক্ষমতার উৎস বা তারাই ক্ষমতার মালিক। কিন্তু মূলত এখানে প্রশাসনকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় আসে রাজনৈতিক দলগুলো এবং জনগণকে তাঁরা ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করে বহির্বিশ্বে প্রচারের জন্য। আপনি বিষয়টা অনুধাবন করলে দেখবেন এই উপমহাদেশে কোন সরকার একবার ক্ষমতায় আসলে সে চিরতরে ক্ষমতার খুঁটি ধরে রাখতে চায়। এই খুঁটি ধরে রাখার জন্য জনগণের স্বার্থ বা জীবন মান অথবা অন্য কোন দেশকে খুশি করে হলেও ক্ষমতায় টিকে তারা থাকতে চায়।

 

এবার আসি ধর্ম কে তারা কেন ব্যাবহার করে, এর একটি কারন হচ্ছে। ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষার হার বাড়লেও জ্ঞানের হার বাড়েনি। প্রান্তিক লেভেলে সেই আগের মতো রয়েছে। ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার, মিথ্যা, অলিক কথাবার্তা যা তারা মন-প্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করেন। অনেক উচ্চ শিক্ষিত লোকের মাজে আপনি এসব দেখাতে পাবেন যে তার মধ্যে রয়েছে মারাত্মক ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং তিনি এটা বড়ো গলাতে বলেন আমার পূর্ব পুরুষরা এভাবে চলতেন বাছবিচার করে। আমরাও এসব মানি এসব করি। তারা শিক্ষিত হয়েছেন পড়াশুনাতে কিন্তু নৈতিকভাবে এখনো সেই ভুলে ভরা পূর্ব পুরুষের ধর্মীয় গোঁড়ামি ধরে রেখেছেন এবং এর ঠিক এই জায়গাটাতে কাজ করে সফল হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। ধর্মীয় মতবাদ বা গোঁড়ামিকে তারা উস্কে দেন গোপনে এবং পানি ঢালেন প্রকাশ্যে।

 

যে যত টেকনিক্যালি পানি ঢালতে পারেন তার দল ততো জনপ্রিয় হয়। আপনি একটু পাশের দেশ গুলোতে তাকালে দেখবেন যেখানে এসব ধর্মীয় গোঁড়ামি বা কুসংস্কার নেই বল্লে চলে। আপনি একটু চোখ দিবেন মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া বা সিঙ্গাপুরের দিকে। যেখানে এসব শূন্য কোঠায় পাবেন। কেন এসব দেশে শূন্য কোঠায় কারন তাঁদের দেশের রাজনীতিবিদরা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিবিদদের মতো লোভীনা। তারা জনগণের সরকার এবং তাঁদের একটি দায় এবং জবাবদিহিতা থাকে। কিন্তু আমাদের দেশ গুলোতেও তো আছে এই জবাবদিহিতা কিন্তু তা কেবল লোক দেখানো। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা অন্য দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখবেন তারা শুধু বড় বড় বাড়ি ঘর বা শিল্প উন্নয়নের দিকে নজর দিচ্ছে না। তাঁদের রয়েছে নৈতিক উন্নয়নের হার।

 

কারন তাঁদের দেশের রাজনীতিতে ধর্ম মিশানো নেই যে এটাকে পুঁজি করে যুগের পর যুগ ক্ষমতায় টিকে থাকতে হবে। দক্ষিণের দেশ গুলোতে উন্নয়ন হচ্ছে ব্যাপক হারে কিন্তু মানসিক উন্নয়ন হচ্ছে না কোন ভাবে, তাইতো কিছু দিন পর পর গো-রক্ষা কমিটির কাছে মার খেয়ে মরতে হচ্ছে গো-খাদকদের। আর সম্পূর্ণ সমর্থন পাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে। তাহলে এতো বড়ো অন্যায় কেন সমর্থন করছেন? এর একটি কারন এই যে ধর্মকে পুঁজি করে ক্ষমতায় থাকা। তবে এবার আসি আমদের দেশের কথায় আমাদের দেশে কি চলছে এ নিয়ে!

 

আমদের দেশের এই গো রক্ষাকারীদের কাছে শিক্ষা নিয়ে চলছে গণপিটুনি নামে সরাসরি পিটিয়ে হত্যা তাও জনসম্মুখে। বিষয়টি হচ্ছে এ দেশে রাজনীতিবিদরা বেশ কৌশুলি এবং অপেক্ষামান। যেমন ধর্ম বা যেকোনো একটি হুজুগ তুলে নিয়ে ফায়দা তুলে নেওয়া। এমনকি সঠিক শাসনের অভাবে জনগণও এই সুযোগটি এখন কাজে লাগাচ্ছেন। ব্যক্তিগত আক্রোশ বা মজার ছলে বা ইচ্ছে হলে যে কেউকে আপনি মেরে ফেলতে পারবেন। শুধু আপনাকে বলতে হবে ধর ধর কল্লাকাটা বা ছেলে ধরা। ব্যাস আপনার কাজ হয়ে গেছে, মানুষকে জানোয়ার ভেবে স্রেফ পিটিয়ে হত্যা করা হবে আর হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হবে একনজর দেখতে এবং ছবি তুলতে। আর একটু গভীরে যাই, ধরেন আপনি ইচ্ছে করে বা অনিচ্ছা সত্বে একটি গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছেন।

 

দোষ আপনার থাকুক আর না থাকুক আপনাকে পিটিয়ে মারা হবে এটা নিশ্চিত থাকুন। অথবা আপনার বাড়ীতে কোন এক ছিঁচকা চোর এসেছে, আপনি তাঁকে ধরেছেন এবার আপনি আসে পাশে ডাক দিলে হবে বাকি কাজটুকুও জ্ঞানহীন জনগণ করে দিবেন। যুগের পর যুগ দিনের পর দিন এসব চলছে এই দেশ গুলোতে যা পৃথিবীর কোন দেশে চলে না। একটি সভ্য দেশে সব কিছুর দেখভাল করবেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী অথচ এই উপমহাদেশে দেখাশুনা করেন জ্ঞানহীন মানুষ নামে কিছু জনগণ। তাই শুধু মুখে বুলি ছুড়লেই হবে না ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতার স্বাদ বন্ধ না করলে সমাধান হবে না এসকল অসভ্যতামীর।

 

শওকত হায়দার
সাংবাদিক
ইনিউজ৭১.কম