আনলিমিটেড নিউজ ডেস্ক: জাকাত আদায়ের জন্য অনেকেই বেছে নেন পবিত্র রমজান মাস। যেহেতু রমজানে একটি নফল ইবাদতে একটি ফরজের সমান পুরস্কার মেলে আর একটি ফরজ ইবাদতে মেলে সত্তর গুণ সওয়াব। জাকাতের উসিলায় লাখ লাখ পরিবারে পৌঁছে যায় প্রয়োজনীয় খাদ্য-বস্ত্র। কারও কারও জন্য জাকাতের টাকায় তৈরি হয় মাথা গোঁজার ঠাঁই। জাকাত মূলত সম্পদ ও মনের পরিশুদ্ধির জন্য। কোনো ব্যক্তি যেন তার কাছে জমে থাকা সম্পদ একান্ত তারই মনে না করে। জাকাত প্রদানের মাধ্যমে সম্পদ জমানোর লোভ ত্যাগ করা হয়, আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ পায়। সেই সঙ্গে সম্পদ বৃদ্ধির ওয়াদা রয়েছে। তবে জাকাত আদায় হতে হবে কোরআন ও হাদিসের নির্দেশিত পথে। জাকাত প্রাপ্যদের তালিকা দেওয়া হয়েছে কোরআনে। গরিব, নিঃস্ব ব্যক্তি, জাকাত আদায় ও বণ্টন ব্যবস্থায় নিয়োজিত ব্যক্তি, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, আল্লাহর পথের পথিক এবং অভাবী মুসাফির জাকাতের অর্থ ও সম্পদ গ্রহণ করতে পারে।

 

নিকট আত্মীয়দের জাকাত দেওয়া উত্তম। তবে নিজের সন্তান বা তার অধস্তনকে কিংবা পিতা-মাতা বা তাদের ঊর্ধ্বতনকে, স্বামী-স্ত্রীকে জাকাত দেওয়া যায় না। জাকাত গ্রহিতাকে ‘এটা জাকাতের সম্পদ’ জানানোর প্রয়োজন নেই। অভাবীদের প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য করে সারা বছরই জাকাত দেয়া উচিত। বরং অত্যন্ত প্রয়োজনের সময় জাকাত দেওয়াটাও অশেষ সওয়াবের কাজ।

জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে টাকা বা সম্পদের পূর্ণ মালিকানা জাকাত গ্রহীতাকে দিতে হবে। জাকাতের টাকায় ব্যক্তি বিশেষকে স্বাবলম্বী করার জন্য ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজিও দেওয়া যায়। ব্যক্তি মালিকানায় নলক‚প, কৃষি সরঞ্জামাদি দেওয়া যায়। গৃহনির্মাণ করে অভাবী ব্যক্তিকে মালিকও বানিয়ে দেওয়া যায়। বিধবা, এতিমের যত্ন, তাদের চিকিৎসা, গরিব ছেলেমেয়ের বিয়ে, গরিবদের লেখাপড়া এমন যেকোনো জনকল্যাণমূলক কাজও করা যাবে।

 

এসব জাকাত কারা দেবেন, এ ব্যাপারে শরীয়তের নির্দেশনা হলো স্বাধীন, প্রাপ্ত বয়স্ক, সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন সম্পদশালী মুসলিম নর-নারী, চন্দ্র বছরান্তে তার জাকাতযোগ্য সম্পদের চল্লিশ ভাগের একভাগ তথা ২.৫ শতাংশ গরিব বা জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তিকে প্রদান করবেন। এটিই জাকাত। ইসলামের দৃষ্টিতে সাহেবে নিসাব বা সম্পদশালী হলেন যার কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও প্রয়োজনীয় খাদ্য-বস্ত্রের অতিরিক্ত স্বর্ণ, রুপা, নগদ টাকা ও ব্যবসায়িক সম্পত্তির কোনো একটি বা কয়েকটি রয়েছে যার সমষ্টির মূল্য সাড়ে সাত তোলা (৮৭.৪৮ গ্রাম) স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা (৬১২.৩৬ গ্রাম) রুপার সমান হয়, তিনিই সম্পদশালী এবং জাকাত দানের উপযোগী।

 

জাকাত বছরের যেকোনো সময় আদায় করা যায়। তবে জাকাত আদায়ের জন্য অনেকে রমজান মাসকেই উত্তম মনে করেন। তবে মনে রাখতে হবে জাকাত আদায়ে যেন মানুষের কষ্ট না হয়। জাকাত প্রদানের প্রদর্শনীর কারণে স্থানে স্থানে দুর্ঘটনা, হতাহতের কথা শোনা যায়। এসব এড়িয়ে চলতে হবে। শুধু ঈদের কয়েকটা দিন তারা আনন্দে থাকুক, এতটুকুতেই সন্তুষ্ট হলে চলবে না। তারা যেন সারা বছর নিজেদের আয়ে চলতে পারে এ জন্য ক্ষুদ্র ব্যবসার কিছু ব্যবস্থা করা গেলে ভালো হয়। যদি জাকাতের একটা অংশ থেকে প্রতি বছর ২/১ জনকে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করা যায়, তাহলেই এক সময় জাকাত নেওয়ার লোক পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে শুধু জাকাত দেওয়ার লোক। ইসলামের ইতিহাস এ কথাই বলে।

 

ড. মুফতী মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী
লেখক : অধ্যাপক, উর্দু বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়