মো. আহসান করিম চৌধুরী :: একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নপ্রসূত একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। দেশের উন্নয়ন ও জনকল্যাণে গৃহীত ১০টি বিশেষ উদ্যোগের অন্যতম একটি। ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ বিনির্মাণসহ “ডিজিটাল বাংলাদেশ” গড়ার বিষয়ে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

 

এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার স্থানীয় সম্পদ, মানবশক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার তথা জীবিকায়নের মাধ্যমে প্রতিটি বাড়িকে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত করেছে। কৃষিজ উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০০৯ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধিসহ আয়বৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য।

 

প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের অর্জিত সাফল্য ও দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রমের গুরুত্ব বিবেচনায় ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটি দেশের ৪৮৫টি উপজেলার সকল ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে মোট ৪০,৫২৭টি গ্রামে সম্প্রসারণের জন্য ২য় সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন করেন।

 

সখিনা বেগম বয়স ৩৫ বছর, দুর্গাপুর গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে তার বিয়ে হয়। তার দু’জন সন্তান, দুরারোগ্যব্যাধিতে তার স্বামী মারা যায়। সখিনা বেগম তখন দিশেহারা হয়ে পড়েন। কি করবে কোথায় যাবে বুঝতে পারছিলনা। সে তার বাবার বাড়িতে চলে যায় সন্তানদেরকে নিয়ে। তখন সে তার ভাবীর কাছে শুনতে পায় যে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের কথা। তারপর সখিনা বেগম সেখান থেকে দশ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে মুরগির খামার দেয় এবং সে ঋণের টাকা পরিশোধও করে ফেলে। এখন সে অনেকটা স্বাবলম্বী।

 

বজন কুমার দাশ মধুরাপুর গ্রাম উন্নয়নের একজন সদস্য। তিনি একটি বাড়ি একটি খামার থেকে ২০০০০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে রসুন চাষ করে। এখন সে রসুন বিক্রি করে বিশ হাজার টাকা ঋণ পরিশোধ করার পরও তার কাছে আরো টাকা থাকে। সে গ্রামের মানুষকে উৎসাহ প্রদান করে যাতে তারাও ঋণ নিয়ে তার মতো স্বাবলম্বী হতে পারে।

 

প্রকল্পটি এ দেশের দরিদ্র মানুষের কল্যাণে গৃহীত একটি মানবিক ও অনন্য উদ্যোগ হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দরিদ্র মানুষকে উচ্চ সুদের ক্ষুদ্র ঋণের হাত থেকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয় এ প্রকল্পে। সেজন্য একটি মডেল নেওয়া হয়- ক্ষুদ্র সঞ্চয় মডেল। এ মডেলের বিশেষত্ব হলো দরিদ্র মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের সাথে সরকারি অনুদান প্রদান করে তাদের স্থায়ী তহবিলের ব্যবস্থা করে দেওয়া এবং ঐ তহবিলের মালিকানা স্থায়ীভাবে তাদের দেওয়। যাতে তারা ঐ তহবিল আয়বর্ধক কাজে বিনিয়োগ করে স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করতে পারে।

 

প্রকল্পের ২য় সংশোধিত মেয়াদকালে ক্ষুদ্র সঞ্চয় মডেলের আওতায় গঠিত মোট সমিতির সংখ্যা ৪০ হাজার ২ শত ১৬টি- যার সদস্য ২২ লাখ দরিদ্র পরিবার। তারা নিজেরা সঞ্চয় করেছেন ১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। এ সঞ্চয়ের বিপরীতে সরকার হতে অনুদান দেওয়া হয়েছে ৮ শত ৯০ কোটি টাকা। ৪০ হাজার ২ শত ১৬টি সমিতিকে ঘূর্ণায়মান ঋণ তহবিলের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ২ শত ৩৪ কোটি টাকা। বর্তমানে এ অর্থ সুদে-আসলে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩ শত ৯৪ কোটি টাকা। এ বিপুল পরিমাণ অর্থ দরিদ্র মানুষগুলোর কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে স্থায়ীভাবে। আর স্থায়ীভাবে এ তহবিল ব্যবহারে সহায়তা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক গঠন করে দিয়েছেন। তহবিলের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্র্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা সম্ভব হবে।

 

জুলাই, ২০০৯ সালে চালুকৃত একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের ৩য় সংশোধনীতে জুন ২০২০ সাল পর্যন্ত মেয়াদকাল ধার্য করা হয়েছে। এতে ৮ হাজার ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৯০টি উপজেলায় ৫৪ লাখ ৬০ হাজার সমিতি সদস্যভুক্ত করা হবে। সমিতি গঠনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫১ হাজার ৯২টি। ৩য় সংশোধনীতে প্রদত্ত নতুন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পাশাপাশি ব্যাংকে স্থানান্তরিত অংশের কাজও চলছে।

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষুদ্র সঞ্চয় মডেলে দরিদ্র মানুষের স্থায়ী তহবিল গঠনে একটি অনন্য উদ্যোগ। মানুষের মধ্যে প্রকল্প সম্পর্কে আস্থা বাড়াতে হবে। ঋণ যথাযথভাবে ব্যবহারে সদস্যদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে। ঋণ বিতরণে কোনো অনিয়ম যেন না হয় সেদিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। যে সকল সদস্যরা সমিতির তহবিল হতে ঋণ নিয়ে সঠিক সময়ে ফেরত দিচ্ছেন তাদের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাত্র ৫ শতাংশ সুদে ৫০ হাজার হতে ১ লক্ষ টাকা ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এছাড়া পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক হতে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা আছে।

 

দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ এ উদ্যোগের সুফল যাতে দরিদ্র মানুষেরা পায় সে জন্য সকলের দায়িত্ব অপরিসীম। খুব তাড়াতাড়িই নতুন জনবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। জেলা সমন্বয়কারী পদেও জনবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এ প্রকল্পের কর্মচারীদের পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইনের বিধান অনুযায়ী ব্যাংকে স্থানান্তরের কাজ চলমান। প্রতিটি অর্থবছরের পুরো সময় নিরলসভাবে কাজ করতে হবে। সকলে মিলে আন্তরিকভাবে কাজ করলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নের একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব।

 

 

একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের অন্তর্নিহিত যে চিন্তা ও চেতনা রয়েছে তা জনগণ ইতোমধ্যে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করেছে। সরকারের প্রতি বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি জনগণের অসীম শ্রদ্ধা ও আস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ঋণের বোঝা থেকে চিরতরে মুক্তি পাবে। জাতীয় জীবনে সৃষ্টি হবে এক নতুন বিপ্লব। দারিদ্র্য বিমোচনে ইতিহাস হয়ে থাকবে- ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ দর্শন।