আনলিমিটেড ডেস্ক::৭ই মার্চের ভাষণ শোষিত মানুষের মুক্তিসনদ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে উত্তাল জনসমদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর  ভাষণ শুধু বাঙ্গালী নয় বিশ্বে শোসিত মানুষের মুক্তিসনদ। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে পূর্ব পাকিস্থান তথা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সিনিয়র সহসভাপতি, মুক্তিযুদ্ধে বৃহত্তর কুমিল্লার মুজিব বাহিনীর প্রধান বর্তমানে দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী এবং ২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলা মামলার প্রধান কৌঁসুলি এডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান এর সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন।

 

তিনি বলেন, তার সঙ্গে ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন নুরে আলম সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শাহজাহান সিরাজ।  ৭ মার্চ সেই ঐতিহাসিক মুহুর্তে রেসকোর্স ময়দানে সমাবেশে তিনিও ছিলেন।

 

তিনি বলেন, সেই উজ্জীবিত জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি হৃদয়বন্দরে গ্রথিত রয়েছে। সেই ভাষণে ছাত্রলীগ কর্মীরা মুক্তিসংগ্রামের জন্য আরো অনুপ্রানিত হয়ে প্রস্তুত হতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর আহ্বান ও সকল নির্দেশ ছাত্রলীগের লক্ষ লক্ষ কর্মী তখন অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তার উত্তরাধিকার হিসেবে  ছাত্রলীগসহ মুক্তিকামীরা তার নির্দেশনাগুলো সংবাদপত্র, সভা-সমাবেশ ও মিছিলের মাধ্যমে সারা বাংলার বাতাসে তখন ছড়িয়ে দিতো।

 

তিনি বলেন, ৭ই মার্চের ভাষণটিকে ইউনেসকো বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ট ভাষন হিসেবে স্বিকৃতি দিয়েছে। তার আগেও এ ভাষণ  বিশ্বের শোষিত মানুষের মুক্তিসনদ হিসেবে তাদের মনের মধ্যে স্থান করে নেয়।

 

সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, কবিরা ভাষণটিকে মহাকাব্য বলেছেন। কেউ কেউ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবিতা বলে বর্ণনা করেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বক্তৃতা বলে চিন্থিত করেছেন। মনস্তাত্ত্বিকরা ৭ মার্চের ভাষণকে দেখেছেন তার দগ্ধীভূত হৃদয়ের বিস্ফোরিত দাবানল হিসেবে। তিনি বলেন, ভাষণটি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পরাজয়কেই কেবল নিশ্চিত করেনি, একটা অদৃশ্য রাখীবন্ধনে সমগ্র জাতিকে শুধু আবদ্ধ করেছে। ওই ভাষণের প্রতিটিশব্দ- তার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ লক্ষ মানুষের মননশীলতাকে এমনভাবে শানিত করেছে যে, সব শ্রেনী-পেশার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার সকলেই তা শুনতে এসেছিলেন। ভাষণ শুনে স্বাধীনতার দৃপ্ত শপথে উজ্জীবিত হয়ে সেদিন ঘরে ফিরেছেন লক্ষ লক্ষ মুক্তিপাগল ও সংগ্রামী মানুষ।

 

সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ লিখিত ছিলোনা। অথচ কি অদ্ভুত শব্দচয়ন কৌশলী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ভাষণ ছিল সেটি। তিনি বলেন, ভাষণটির পর পাকিস্তানি সামরিক জান্তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু ভাষণে সেনাবাহিনীকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, “তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিচ্ছু বলবে না।” অন্যদিকে বলছেন- “আর যদি একটি গুলি চলে- যদি আমার লোককে হত্যা করা হয় তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইলো- প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।” বঙ্গবন্ধু নির্দেশনা দিলেন- “আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি-যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।” বঙ্গবন্ধু কতটা দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন এবং মানুষ কি চায় সেই পালস্ তিনি বুঝতে পারতেন ভাষণটি তার উজ্জল দৃষ্টান্ত।

 

সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, বঙ্গবন্ধুর পুরো ভাষণ এতটাই বাস্তব ও সুদূরপ্রসারী ছিল যে, প্রতিটি মানুষ উজ্জীবিত হলো- শুধুমাত্র শত্রুর আক্রমণকে প্রতিহত করা নয়, শত্রুর যে কোনো সশস্ত্র আক্রমণকে প্রতিরোধ এবং মোকাবেলার দিকনির্দেশনাও ছিলো।

 

সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, ৭ মার্চের ভাষণের দিক নির্দেশনা অনুযায়ি শেখ ফজলুল হক মণির  তত্ত্ববধানে মুক্তিসংগ্রামের জন্য ছাত্রলীগ কর্মীদের বাছাই করে মুজিব বাহিনী গঠন শুরু হয়। তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যেই সুস্পষ্ট হয়ে যায় পাকিস্তানের শোষণ-নির্যাতন থেকে মুক্ত হতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা।

 

তিনি বলেন, আজ বুধবার সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। তবে এবার ৭ মার্চের গুরুত্ব ও তাৎপর্য আরও বেড়ে গেছে বঙ্গবন্ধুর শিহরণ জাগানো ভাষণটি ইউনেস্কোর তরফ থেকে বিশ্ব ঐতিহ্যের দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায়। এই স্বীকৃতি সেই ঐতিহাসিক দিনটি উদযাপনে যোগ করছে নতুন মাত্রা।

 

সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, স্বাধীনতার জন্য অদম্য স্পৃহা নিয়ে সংগ্রামরত মুক্তিকামী মানুষের আশা আকাংকা বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধু সেদিন বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এ উচ্চারণ থেকেই আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা তরান্বিত হয় এবং ৬ দফার আন্দোলন এক দফায় রূপ নেয়।

 

তিনি বলেন, আজ সেই ৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২২ মিনিটে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম এবং বিশে^ও অন্যতম ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। অগ্নিঝরা ৭১’এর এইদিনে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুই ছিলেন একমাত্র বক্তা। সে দিন ছাত্রলীগসহ স্বাধীনতাকামী ছাত্রনেতারা মাইকে নানা ধরনের শ্লোগান দিয়ে উপস্থিত জনতাকে উজ্জীবিত রাখেন। সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, বিগত ৪৭ বছরে অনেক কিছুই বদলে গেলেও বদলানো যায়নি শুধু ২২ মিনিটের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণটি। বিশ্বের অনেক মনীষী বা নেতার অমর কিছু ভাষণ আছে। বিশ্বের মধ্যে এটিই একটি মাত্র ভাষণ, যা যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বেজে চলেছে কিন্তু ভাষণটির আবেদন এতটুকু আজও কমেনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই ভাষণে দেশপ্রেমে উজ্জিবিত হবে।